মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২ আশ্বিন ১৪২৯  |   ২৮ °সে আপডেট : ০৫ জুলাই, ২০২২

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২১, ২১:১৬

ধুঁকে ধুঁকে চলছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাখাত, হতাশ চাকুরিপ্রার্থীরা

মোঃ ওয়ালী উল্লাহ (রানা)
ধুঁকে ধুঁকে চলছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাখাত, হতাশ চাকুরিপ্রার্থীরা

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘জাতি গঠন’ –এ মনোনিবেশ করেন। তিনি জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষাকে বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭২ সালেই ‘কুদরত ই খুদা’ শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। সেই সাথে একই বছর রচিত নতুন রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়ন করে শিক্ষা-কে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়।

কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের ১২ নং অধ্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ‘শিক্ষক প্রশিক্ষণ’ –এর বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। শিক্ষণ-শিখন উন্নয়নে এ ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একটি শক্তিশালী ও টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন একদল দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক। কেননা শিক্ষকের জ্ঞানগত দক্ষতার পাশাপাশি পেশাগত দক্ষতা না থাকলে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করানো সম্ভব হবে না। সেই লক্ষ্যে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য যে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে সেগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর জোর দেয়ার সুপারিশ করেছে কুদরত ই খুদা শিক্ষা কমিশন।

কিন্তু শিক্ষণ-শিখন উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান চিত্র কেমন তা আলোচনা করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান "প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট" (পিটিআই) যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদী ও বুনিয়াদি এবং শিক্ষাবিজ্ঞানের উপর প্রশিক্ষণ দেয়। আর এ প্রশিক্ষণের দায়িত্বে থাকেন ‘শিক্ষা’ বিষয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রশিক্ষক। অথচ দেশের ৬৭টি সরকারি পিটিআইতে কয়েকশ 'প্রশিক্ষক' পদ খালি পড়ে আছে বছরের পর বছর। সর্বশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০১৮ সালের মাঝামাঝি প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) এ নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। চার বছর শেষ হতে চললেও আজ অব্দি এ নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানটি তার উদ্দেশ্য পূরণে বাধা পাচ্ছে। এমনকি পিটিআই সংযুক্ত বিশেষায়িত ‘পরীক্ষণ বিদ্যালয়’ যা শিক্ষাবিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখানেও ৩০০ এর বেশি ‘শিক্ষক’ পদ খালি পড়ে আছে। এখানে সর্বশেষ নিয়োগ হয়েছিল ৯০ এর দশকে। সর্বশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০১৯ সালে প্রকাশিত হলেও আজ অব্দি নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হয়নি। ফলে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে পিটিআই ও সংযুক্ত পরীক্ষণ বিদ্যালয়।

এ ছাড়াও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তের অধীন শিক্ষা-গবেষণার বিশেষায়িত পদ "গবেষণা সহকারী" এর মাত্র ২১ টি পদের নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা গত ২১ অক্টোবর ২০২১ এ সম্পন্ন হলেও রেজাল্ট প্রকাশিত হয়নি আজ অব্দি। ফলে গবেষণা ক্ষেত্রেও দেশের শিক্ষাখাত পিছিয়ে আছে বলা যায়।

আরেকটি আলোচনার অবতারণা করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। স্বাধীনতা পরপরই বঙ্গবন্ধু দেশে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেন। প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষাকে সহজলভ্য ও অবৈতনিক করার লক্ষ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দেশের প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আইনের মাধ্যমে জাতীয়করণ করেন। পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নভাবে ঝড়ে পড়া ও বিদ্যালয় বহির্ভূত শিশুদের প্রাথমিক-মৌলিক শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া।

তবে বর্তমান সরকার চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি ৪(পিইডিপি ৪) এর আওতায় ২০১৮ সালে ঝড়ে পড়া ও বিদ্যালয় বহির্ভূত শিশুদের জন্য বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয় যা ''আউট অব স্কুল চিলড্রেন এডুকেশন" নামে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, প্রকল্পের কার্যক্রম ২০১৮ সালে শুরু হলেও আজ অব্দি শিখন কেন্দ্র চালু হয়নি। সেই সাথে প্রকল্পের উপজেলা পর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধি "উপজেলা প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর" নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে সম্পন্ন হলেও আজ অব্দি ফলাফল প্রকাশিত হয়নি।

উপরে বর্ণিত বিশেষ পদগুলো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার টেকশই উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারযোগ্য এবং "শিক্ষাবিজ্ঞান" বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের জন্য বরাদ্দ। দেশে হাজার হাজার "শিক্ষায়'' ডিগ্রিধারী বেকার বসে আছে অথচ শিক্ষাখাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ধুকে ধুকে চলছে।

আর এভাবেই বাংলাদেশের শিক্ষাখাত এগিয়ে চলছে। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো দেশ ও জাতি শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিয়ে উন্নত হতে পারেনি। আর আমরা মুখে যাই বলি না কেন বাস্তবে শিক্ষাখাত খুবই দুর্বল অবস্থানে আছে।

লেখক, সহকারী সমন্বয়ক, এশিয়ান সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ এডুকেশন (এসিআইই), বাংলাদেশ।

সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত